পুকুরে কৈ মাছ চাষ

কৈ মাছ চাষের সুবিধা* যে কোন ধরণের চৌবাচ্চা, জলাশয় এমনকি খাঁচায়ও চাষ করা যায়।
* এরা খুব দ্রুত বাড়ে, সাধারণত চার মাসে বাজারজাত উপযোগি হয়।* শ্বাস প্রশ্বাসের জন্য কই মাছের বাড়তি অঙ্গ থাকায় তাজা অবস্থায় মাছ বিক্রয় করা সম্ভব।* পুষ্টিগুন অনেক বেশি, সুস্বাদু তাই বাজার মূল্য অনেক বেশি।* বিরূপ পরিবেশেও বেঁচে থাকতে সক্ষম এবং মৃত্যুর হার খুবই কম।* অধিক ঘনত্বে চাষ করা যায়।* রোগবালাই নেই বললেই চলে।* তুলনামূলক অল্প পঁজিতেই চাষ করা সম্ভব।* কই মাছ মূলত কীট-পতঙ্গভূক। একারণে পোকামাকড়, ছোট মাছ, ব্যাঙের পোনা, শামুক, ঝিনুকের মাংস ইত্যাদি সরবরাহ করে এ মাছ চাষ করা যায়।


স্থান নির্বাচন ও পুকুরের বৈশিষ্ট্য* পুকুর রৌদ্র আলোকিত খোলামেলা জায়গায় হাওয়া উত্তম এবং পাড়ে ঝোপ- জঙ্গল থাকলে তা পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। পাড়ে বড় গাছপালা থাকলে সেগুলোর ডালপালা ছেঁটে দিতে হবে এবং দিনে কমপক্ষে ৮ ঘন্টা রৌদ্রালোক পড়া নিশ্চিত করতে হবে।* ব্যবস্থাপনা সুবিধার জন্য পুকুর আয়তকার হতে হবে* পুকুরের আয়তন ২০-৩০ শতাংশের মধ্যে হলে ব্যবস্থাপনা করতে সুবিধা হয়, তবে পুকুরের আয়তন ৫০ শতাংশের বেশি না হওয়াই উত্তম।* পুকুরের গড় গভীরতা ৪.৫-৫.৫ ফুট হলে ভাল হয়, যেখানে বৎসরে ৫-৬ মাস পানি থাকে।* বন্যামুক্ত ও বসতবাড়ীর আশে পাশে।


পুকুর প্রস্তুতি* প্রথমে পুকুরকে সেচের মাধ্যমে শুকিয়ে ফেলা প্রয়োজন। পুকুর শুকানো সম্ভব না হলে প্রতি শতাংশে প্রতি ফুট গভীরতার জন্য ১৮-২৫ গ্রাম রোটেনন পাউডার দিয়ে সব ধরনের মাছ অপসারণ করা যায়।* পুকুরের তলায় কাদা হওয়ার বেশি সম্ভাবনা থাকলে হালকা করে কিছু বালি (দালান-কোঠা নির্মাণের জন্য যে বালু ব্যবহৃত হয়) ছিটিয়ে দেয়া যেতে পারে। এর ফলে পুকুরের তলায় গ্যাস হবে না, পানি পরিষ্কার এবং পরিবেশ ভাল থাকবে।* রোটেনন প্রয়োগের ২-৩ দিন পর শতাংশ প্রতি ১ কেজি হারে পাথুরে চুন প্রয়োগ করতে হবে। তবে চুন ছাড়াও জিওলাইট (প্রতি শতকে ১ কেজি) পুকুর প্রস্তুতির সময় প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।* উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি তথা প্রাকৃতিক খাদ্যে বৃদ্ধির জন্য সার প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। পুকুর প্রস্তুতির শেষ ধাপে সার প্রয়োগ করা হয়। চুন প্রয়োগের ৪-৫ দিন পর শতকে ৮০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ৪০ গ্রাম টিএসপি সার প্রয়োগ করা হয়।


পুকুরে বেষ্টনি প্রদান ও পোনা মজুদ* কই মাছ অতিরিক্ত শ্বসন অঙ্গ দিয়ে বাতাস থেকে অক্সিজেন নিয়ে পানির উপরে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। বৃষ্টির সময় এরা কানকুয়া ব্যবহার করে দ্রুত চলতে পারে। সেজন্য পুকুর পাড় অবশ্যই নাইলনের ঘন জাল/টিন সীট দ্বারা ঘিরতে হবে।* ছোট ফাঁসযুক্ত জাল/টিন সীট দ্বারা পুকুরটি ঘেরার পর প্রতি শতাংশে ১-১.৫ ইঞ্চি মাপের ৩০০-৩২৫টি কই-এর (থাই/ভিয়েতনামি কই) পোনা মজুদ করতে হবে।* একই সাথে ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে নিবিড় কৈ চাষের ক্ষেত্রে শতাংশ প্রতি ৩-৫ টি কাতলা মাছের পোনা ছাড়া যেতে পারে।* কৈ মাছের সাথে শতকে ২০টি মাগুর অথবা ১০টি শিং মজুদ করা যেতে পারে।* পরিবহন জনিত কারণে পোনার শরীরে ক্ষত হতে পারে তাই বালতিতে ১০ লি. পানি নিয়ে এর মধ্যে ২০০ গ্রাম খাবার লবণ অথবা ১ চা চামচ KMnO4 মিশাতে হবে। অতঃপর বালতির উপর একটি ঘন জাল রেখে তার মধ্যে ২০০-৩০০টি পোনা ছাড়তে হবে।* যদি সম্ভব হয় পোনা ছাড়ার সময় থেকে ১০-১২ ঘন্টা পুকুরে হালকা পানির প্রবাহ রাখতে হবে।
খাদ্য ব্যবস্থাপনা* ৩৫% প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার কৈ চাষের জন্য উপযোগী। এদের খাবারে প্রাণীজ প্রোটিন বেশী হওয়া আবশ্যক। তা ছাড়া মাছের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য গ্রোথ প্রোমোটর, ভিটামিন ও এনজাইম খাদ্যের সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করতে হবে।* পোনা মজুদের পরের দিন থেকে মাছকে তার দেহ ওজনের ১৬ ভাগ থেকে আরম্ভ করে দৈনিক খাবার দিয়ে যেতে হবে।* প্রতি ১৫ দিন অন্তর খাদ্য প্রয়োগের হার ১% করে কমাতে হবে।* মাছের ওজন ৫০ গ্রামের উর্ধ্বে উঠলে খাদ্য প্রয়োগের পরিমাণ হবে তার দেহ ওজনের শতকরা ৫ ভাগ।

কৈ মাছের রোগ ও প্রতিকার* মাছ নিয়মিত বাড়ছে কিনা এবং মাছ রোগাক্রান্ত হচ্ছে কিনা জাল টেনে মাঝে মাঝে তা পরীক্ষা করতে হবে।* ভাইরাস, ব্যাকটিরিয়া, ফাংগাস জনিত কোন রোগ যেন না হয় তার জন্য আগে থেকেই প্রতি শতাংশ ১ গ্রাম হারে Timsen (টিমসেন) ১৫ দিন পর পর ব্যবহার করতে হবে।ক্ষত রোগ: ৫০০ গ্রাম চুন + ৫০০ গ্রাম লবনক্ষত রোগের প্রাদুর্ভাব হলে পুকুরে জীবানুনাশক (টিমসেন – ৮০ গ্রাম/বিঘা (১ম ডোজ) ও ৫০ গ্রাম/বিঘা (২৪ ঘন্টা পর ২য় ডোজ) ব্যবহার করতে হবে। একই সাথে এন্টিবায়োটিক হিসাবে ২ গ্রাম অক্সিটেট্রাসাইক্লিন প্রতি কেজি খাবারের সাথে মিশিয়ে ৭ দিন প্রয়োগ করতে হবে ।অন্যান্য ব্যবস্থাপনা* পুকুরের পানি ভালো রাখার জন্য ১৫ দিন পর পর হররা টেনে দিতে হবে।* চাষকালীন সময়ে শামুকের আধিক্য পরিলক্ষিত হলে শতাংশ প্রতি ১০০-২০০ গ্রাম ইউরিয়া প্রয়োগে শামুকের আধিক্য কমবে।* কৈ মাছ চাষে প্রথম দুই মাস নিয়মিত (প্রতি ১৫ দিন অন্তর ২০-২৫% পানি পরিবর্তন) পানি পরিবর্তন করতে হবে কিন্তু দ্বিতীয় মাসের পর থেকে পানি পরিবর্তন করলে মাছের পেটে ডিম চলে আসবে।* অ্যামোনিয়া গ্যাস দূর করার জন্য অ্যামোনিল (প্রতি একরে ২০০ মি.লি.) ব্যবহার করতে পারেন।* ফাইটোপ্লাঙ্কটনের প্রতি কৈ মাছের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। এ কারণে পানিতে ফাইটোপ্লাঙ্কটন ব্লুম থাকা যাবে না। কৈ চাষের পুকুরে চাষকালীন সারের তেমন প্রয়োজন নেই।* ক্ষত রোগ থেকে মাছকে মুক্ত রাখতে প্রতি মাসে একবার পুকুরে জিওলাইট অথবা চুন দিতে হবে (শতকে ২০০ গ্রাম)।* ১৫ দিনে একবার নমুনা সংগ্রহ করে গড় বৃদ্ধির সাথে সঙ্গতি রেখে মোট খাদ্যের পরিমাণ ঠিক করে নিতে হবে।* গ্রীষ্মকালে অনেক সময় পুকুরের পানি কমে যায় এবং তাপমাত্রা বেড়ে যায়। তখন অনেক সময় পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি হয়। এরকম পরিস্থিতিতে খাবার প্রয়োগ কমিয়ে দিতে হবে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা থেকে মাছকে রক্ষা করতে পুকুরের একটি স্থানে কিছু কচুরিফানা অথবা ককসীট দেওয়া যেতে পারে।* একটানা মেঘলা আবহাওয়ায় কিংবা অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিতে হবে অথবা একেবারে বন্ধ করে দিতে হবে।* প্রতি ১৫ দিনে একবার প্রোবায়োটিক ব্যবহার করলে মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে ও পানির পরিবেশ ভাল থাকবে।* মাছ নিয়মিত খাবার খায় কিনা সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।* এক পুকুরের জাল অন্য পুকুরে ব্যবহারের আগে ভাল পানির সাথে জিবাণু নাশক পটাশ মিশিয়ে পরিষ্কার করে নিন।* অনেক সময় বক, মাছরাঙা, জলজ পাখি থেকে রোগ জীবাণুর সৃষ্টি হয়। তাই পুকুরের চারদিকে রঙিন ফিতা টানিয়ে দিন।
আহরণ ও বিক্রয়* চারমাসে থাই কৈ মাছ প্রতিটির গড় ওজন হবে ৭০-৮০ গ্রাম।* চারমাসে ভিয়েতনামি কৈ মাছ প্রতিটির গড় ওজন হবে ১৫০-২০০ গ্রাম।* চারমাস পর থেকেই আংশিক বা সম্পূর্ণ মাছ বিক্রয় করা যায়।* মধ্যপ্রাচ্যে কৈ মাছের চাহিদা অনেক বেশি তাই রপ্তানীর সুযোগ রয়েছে।


*** বিস্তারিত জানার জন্য আপনার নিকটস্থ উপজেলা মৎস্য দপ্তরে যোগাযোগ করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *